হুমায়ূন আহমেদের লেখা যতগুলো বই আমি এ পর্যন্ত পড়েছি, সেগুলোকে আমি মোটামুটি তিনটা ভাগে ভাগ করতে পারি।
১. উনার শুরুর দিকের লেখাগুলো, যেগুলোতে মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের অভাব অনটন মূল বিষয় হিসেবে উঠে আসতো।
২. মাঝের দিকের বইগুলো, যেগুলোতে অসম প্রেম ভালোবাসার গল্প খুব বেশি প্রাধান্য পেত।
৩. একদম শেষের দিকের লেখাগুলো, যেগুলো না লিখলেও চলতো বলে মনে হয় আমার!
এই বইটা আমার লিস্টের প্রথম গ্রুপের সদস্য।
“পেন্সিলে আঁকা পরী’ নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে এর নামের ব্যাপারটি। পেন্সিল এবং পরী এই দুইটি নাম শিরোনামে দেখে অনেকে হয়ত এটিকে শিশুতোষ বই ভেবে বসতে পারেন এবং তার ফলে তারা যদি ছোট বাচ্চাদের জন্য এই বইটি কেনেন, তাহলে সেটা খুবই ভুল কাজ হবে। এই বইটির বিষয়বস্তু যেরকম তা পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবন করতে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক হওয়াই যথেষ্ট নয়। পাঠককে হতে হবে প্রাপ্তমনস্কও। নাম দেখে আরও একটা বিভ্রান্তি পাঠকের মনে দেখা দিতে পারে।
পেন্সিল, ফাউন্টেনপেন, বলপয়েন্ট এরকম নানা নামে হুমায়ূন আহমেদ নিজের আত্মজীবনী লিখেছেন। তাই এই বইয়ের শিরোনামে পেন্সিল শব্দটা দেখে যদি কেউ মনে করে থাকেন এটিও আত্মজীবনী টাইপের বই তাহলেও ভুল হবে। এটি সম্পূর্ণরূপে একটি সমকালীন ও জীবনঘনিষ্ঠ সামাজিক উপন্যাস। শুরুতে প্রাপ্তবয়স্কতা ও প্রাপ্তমনস্কতার কথা বলায় অনেকে আগ্রহী হতে পারেন, এই বইতে যৌনতা আছে কিনা। তারা যদি হুমায়ূন আহমেদের লেখার নিয়মিত পাঠক হয়ে থাকেন তাহলে তারা অবশ্যই জেনে থাকবেন যে হুমায়ূন আহমেদের লেখায় যৌনতার দুই-একটি ইঙ্গিত মাঝেমধ্যে আসলেও সরাসরি তিনি যৌনতাকে হাইলাইট করে কোন লেখা কোনদিন লেখেন নাই।
একইভাবে এই উপন্যাসেও যৌনতার বিষয়টি কাহিনীর সাথে সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে এসেছে কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের তার লেখার ওপর এতটাই নিয়ন্ত্রন যে তিনি এই যৌনতার বিষয়টিকে কখনোই মাত্রাছাড়া হতে দেন নি। ‘পেন্সিলে আঁকা পরী’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র দুইটি। এদের মধ্যে নারী চরিত্র যে, তার চরিত্রিকে লেখক একাধিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। কখনো সে পরিবারের বড় মেয়ে মিতু, বাবা মারা যাবার পর এবং বড় ভাই জেলবন্দি হবার পর থেকে যে অতি নিষ্ঠার সাথে তাদের সংসার চালানোর গুরুদায়িত্ব পালন করে চলেছে। কখনো আবার মেয়েটির পরিচয় রেশমা, যে এফডিসির ছবির অতি সামান্য একজন এক্টর।পর্দায় তাকে দেখা যায় আধ-একবারের মত আর সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর যার রোজগার হয় মাত্র আড়াইশ টাকা। এই মেয়েটিই আবার কখনো হয়ে যায় টেপী।
সংসারে যখন টানাটানি চলে, তখন টেপী হয়ে মেয়েটিকে ‘ক্ষেপ’ ধরতে যেতে হয়। বড়লোকের বিছানায় শুয়ে নিজের শরীরটাকে বিকিয়ে দিতে হয়। মিতু, রেশমা আর টেপীর মধ্যে সবসময় মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব চলে। একেক সময় একেকটি চরিত্র এসে মেয়েটির সত্যিকারের পরিচয়কে ছাপিয়ে যায়। এই মেয়েটিরও যে একটি ব্যক্তিগত জীবন আছে, সুখ-দুঃখ আছে, ভালোবাসা বোধ আছে মিতু, রেশমা আর টেপী – এই তিন চরিত্রের ভিড়ে হারিয়ে যায়। কিন্তু তারপরও মেয়েটা তার ভালোবাসাকে খুঁজে ফেরে, মবিন নামে তার প্রেমিককে নিয়ে বিয়ের সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চায়। কিন্তু যখন সেই সময় উপনীত হবে, তখনো কি মেয়েটা তার অতীতের ত্রিমুখী পরিচয় থেকে বেরিয়ে এসে শুধুই ‘মবিনের প্রেমিকা’ হয়ে উঠতে পারবে? মবিনও কি তার সব অতীত জানার পরও তাকে মেনে নেবে, তাকে ভালোবাসার বাঁধনে জড়িয়ে রাখতে চাবে? এমন কাহিনী এই উপন্যাসের একাংশের।
পেন্সিলে আকা পরি উপন্যাসের আরেকটি যেই চরিত্র আছে সেটি হল মোবারক সাহেব। অর্ধ বয়স্ক এই বিশাল ধনী মানুষটির সব আছে। শুধু মানসিকভাবে লোকটা মরে গেছে। সেই মৃত মনকে আবারো বাঁচিয়ে তুলতে বিভিন্ন বিচিত্র কাজে তিনি নিজেকে জড়ান। নিজেকে না, মূলত তার অগণিত অর্থকে জড়ান আর বাইরে থেকে সব কাজকে তিনি নিয়ন্ত্রন করতে চান। ব্যক্তিগত জীবনে ভীষণ অসুখি কিন্তু সুখি মানুষের অভিনয় করতে থাকা এই মানুষটির সাথে একদিন রাতে তার বিছানায় আলাপ হয় স্ট্রিটগার্ল টেপীর। টেপী নামক মেয়েটির আচার আচরণে অভিভূত মোবারক সাহেব খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারেন টেপী নামের মেয়েটির আছে আরও দুইটি চরিত্র। একটা সময় এই মেয়েটির সাথে অদৃশ্য বাধনে জড়িয়ে পড়েন মোবারক সাহেব। শুধুমাত্র মেয়েটিকে জীবনে প্রতিষ্ঠিত করে তুলবেন বলে তিনি ছবি প্রযোজনায় নামলেন। একদিন মেয়েটাকে বললেন সে যা চাইবে তার কাছে, তা-ই সে দিবে। কিন্তু টেপী বা রেশমা বা মিতু নামের মেয়েটা কি চাবে তার কাছে? এই কাহিনী হল উপন্যাসের বাকি অর্ধাংশের। যে দুইটি আলাদা আলাদা
কাহিনীর কথা বললাম, সেই দুই কাহিনী একই সমান্তরালে প্রবাহিত হয়েছে এই উপন্যাসে। পাশাপাশি মিতু, মবিন, মোবারক সাহেবদের পারিবারিক অবস্থা, পরিবারের সদস্যদের অবস্থান ইত্যাদির সংযোজনে উপন্যাসের গাথুনি আরও বেশি মজবুত ও পাকাপোক্ত হয়েছে। ‘পেন্সিলে আঁকা পরী’ উপন্যাসের শুরু থেকে প্রায় শেষ অবধি রয়েছে শুধু দুঃখ, কষ্ট, অপমান, হাহাকার, একাকীত্ব, অভাব ইত্যাদির প্রামাণ্য চিত্র। কিন্তু উপন্যাসের শেষের চমক এবং সুখ-সমাপ্তি নিঃসন্দেহে পাঠকের হৃদয় মনকে ভালো লাগায় দ্রবীভূত করবে বলে আমার ধারণা।
হুমায়ূন আহমেদের উক্তি:
১.পৃথিবীতে সবচে’ সুন্দর করে মিথ্যা কারা বলে- অভাবী মানুষেরা। সবচে’ সুন্দর অভিনয় কারা করে? অভাবী মানুষরাই করে। সারাক্ষণ তাদের অভিনয় করতে হয়।”
২.”এই পৃথিবীতে সবচে’ খারাপ জায়গা হল পায়খানা। মানুষের মুখ সেই পায়খানার চেয়েও খারাপ। পায়খানার দরজা বন্ধ করা যায়, তালা দেওয়া যায় – মানুষের মুখ বন্ধ করা যায় না।”